রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

হারিয়ে যাচ্ছে বাদল দিনের কদম ফুল

প্রতিকী ছবি

রণজিৎ মোদক : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন বাংলাদেশ। তাই তো কবি তার কবিতায় বলেছেন, ‘বাংলার মুখে আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ বিশ্ব ¯্রষ্টা সমস্ত সৌন্দর্য উজার করে দিচ্ছেন। আর তারই সৃষ্ট মানুষ সেই সৌন্দর্যের ডালা থেকে নিষ্ঠুর কুঠার দ্বারা ধ্বংস করে বৃক্ষ তরু। হারিয়ে যাচ্ছে বাদল দিনের কদম ফুল।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষা এক অনন্য ঋতু। বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানায় কদম ফুল। কদম ফুল মানুষের মন উদাস করে। কিসের যেন অভাব, না পাওয়ার বেদনা মানুষকে অভিভূত করে তোলে। মন চায় প্রিয়জনকে কাছে পেতে। অপ্রাপ্য আনন্দ খোঁজে মানুষ। মনের অজান্তেই গেয়ে উঠে “চেয়ে আমি আকাশ পানে কোন কাজ নাহি হাতে/ কোন কাজে নাহি বসে মন। তন্দ্রা আছে, নিদ্রা নাই, দেহ আছে, মন নাই, পৃথিবী যেন অস্ফুট স্বপন।” আষাঢ়ের কালিমাখা মেঘের অন্ধকারে লুকানো কদম ফুল মানব মনের পর্দায় এক অজানা শিহরণ জাগায়। বিরহী মন তখন কেঁদে উঠে, তুমি কোথায়! তুমি কোথায়! বেদনা বিধূর তপ্ত হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টি কামনা জাগে।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গীত বিজ্ঞানে গেয়েছেন। মেঘের ছায়ায় অন্ধকার রেখেছি ঢেকে তারে এই যে, আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান আজ এনে দিলে হয়তো দিবেনা কাল-রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল। গ্রাম বাংলার মেঠো পথে হেঁটে যেতে যেতে প্রায়ই বাসাসের গাঁ ছুঁয়ে মোহনীয় কদম ফুলের গন্ধ পাওয়া যেতো। এ মোহনীয় গন্ধে স্বর্গীয় সুবাস ছড়াতো চারিদিক। কদম গাছ নিয়ে অনেক কবি কবিতা লিখেছেন। দ্বাপর যুগে শ্রী বৃন্দাবন লীলা মাধুর্যের কদম বৃক্ষের কথা উল্লেখ রয়েছে। অবতার পুরুষ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কদম্ব শাখায় বসে বংশী বাজিয়েছিলেন। সেদিক দিয়ে কদম বৃক্ষের প্রাচীনত্ব প্রমাণ রয়েছে।

নবদঈপ শ্রীধাম মায়াপুরে চন্দ্র উদয় মন্দিরকে ঘিরে রাস্তার দু’ধারে প্রচুর কদম বৃক্ষ রয়েছে। সেখানে স্বর্গীয় সুবাস ছড়াচ্ছে কদম ফুল। অথচ এই কদম গাছ রক্ষণাবেক্ষনে আজকাল তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ম্যাচ ফ্যাক্টরী ও ইট ভাটায় ধ্বংস করা হচ্ছে কদম গাছ।

একদিকে সরকার বৃক্ষরোপনের কথা বলছে অন্যদিকে ম্যাচ ফ্যাক্টরীসমূহ দিয়াশলাইয়ের বাক্স তৈরীতে কদম বৃক্ষ ধ্বংস করছে। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার কদম বৃক্ষ ধ্বংস হচ্ছে। কদম বৃক্ষের যেমন রয়েছে ভেষজ গুণ তেমনই ফুলে রয়েছে বায়ু দূষণমুক্ত রাখার সুগন্ধি শক্তি। কদম বৃক্ষ অনেকটা নিজ থেকেই জন্মে তেমন যতœাদি করতে হয় না। অল্পদিনেই কদম গাছ বেশ বড় হয়ে উঠে। কদম গাছের পাতা বেশ বড়। কদম ফুল গোল। শক্ত গোল গোটার উপর হাজার হাজার ছোট ছোট পাপড়ি দ্বারা আচ্ছাদিত। তার উপর আরও সুন্দর নরম দীর্ঘ সাদা-হলুদ পাপড়ি। কদম ফুল আরও মোহনীয় রূপ ধারণ করে।

এ মোহনীয় কদম ফুলের রেণুর আকর্ষণে হয়তো বনচারি অজান্তেই বলে উঠে “নসাং জেবারে জাগাং চারি/ ইদু আগং জনমন পুরি/ এ জাগা গান রইয়েছে মা মনান জুরি।” এই সুন্দর নিবিড় বনের মায়াময় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছে, মাতাল উদাস করে দিয়েছে, এ জায়গা ছেড়ে আমি কোথাও যাবোনা। মানুষ ইচ্ছা করলে তার আশপাশ সুন্দর বৃক্ষময় করে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সেই সদিচ্ছা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। সে কারণে ঋতু বৈচিত্র্যের এ বাংলাদেশে কদম বৃক্ষ হারিয়ে যাচ্ছে।

কবি, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট রণজিৎ মোদক।

 

লেখক:
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
মুঠোফোন : ০১৭১১৯৭৪৩৭২

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


© All rights reserved © 2020 bdnewseye.com
Developed BY M HOST BD