• শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৬ পূর্বাহ্ন
  • |
  • ⇅ Bangla Converter
  • |
শিরোনাম :
রূপগঞ্জে দিনব্যাপী বিভিন্ন দপ্তর ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন সহ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উদ্বোধনে ডিসি মো: রায়হান কবির সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সাথে মহিলা পরিষদ’র মতবিনিময় সভা নারায়ণগঞ্জে চেকপোস্টে বিদেশি পিস্তল, হেরোইনসহ ২ ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার নারায়ণগঞ্জ সদরে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার মহড়া তীব্র তাপদাহে ডিসি-এসপির যৌথ মানবিক উদ্যোগে পথচারী, ট্রাফিক ও শ্রমজীবীদের মাঝে পানি ও স্যালাইন বিতরণ সাংবাদিক মীর দিনারের মায়ের মৃত্যুতে নারায়ণগঞ্জ জার্নালিস্ট ইউনিটির দোয়া মাহফিল চুয়েটে ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ ভিসি, ডিসি জাহিদের মধ্যস্থতায় মুক্ত জিনিয়া নাট্য সংগঠনের উদ্যোগে নাট্যত্রয়ের শুভ মহরত অনুষ্ঠিত সাংবাদিক মীর দিনার হোসেনের মায়ের ইন্তেকালে এনপিজেএ, আইবিএন নিউজ ও আমেরিকান প্রেস ক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিন -এর শোক পারিবারিক জমি উদ্ধারে মুঘল সম্রাটদের ১৬তম বংশধর দাবিদারদের সংবাদ সম্মেলন

একজন কিংবদন্তি ও এক অনন্য ভালোবাসার নাম লিওনেল মেসি -সুমন চৌধুরী

সুমন চৌধুরী / ১৪৯ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

সেদিন রাতে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর বউ বলল, ‘আজ মেসির শেষ খেলা ছিল, তুমি জানতেই না? দেখলেও না?’ কথাটা বলার সময় ওর চোখেমুখে বেশ অবাক হওয়ার ছাপ। কারণ, মেসিকে নিয়ে আমার আবেগের সঙ্গে ওর পরিচয়

দীর্ঘদিনের। ও জানে, মেসির এমন একটা দিন আমি ভুলে যাব, এটা যেন আমার সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না!

কিন্তু গত সপ্তাহে অফিসের কাজে এতটাই চাপের মধ্যে ছিলাম যে, মেসির Last Dance-এর কথাটাই যেন মাথা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। সমস্ত মনোযোগ তখন কাজের ওপর। অথচ দিনভর বারবার মনে হচ্ছিল, মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে নিজের আবেগ আর ভালোবাসার কথাগুলো একবার ফেসবুকে লিখি। কিন্তু সময় আর পরিস্থিতি কোনোটাই যেন সায় দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত রাতে সময় করে লিখেছিলাম ঠিকই।

আসলে মেসিকে ঘিরে এই আবেগ, এই ভালোবাসা—কিছু অনুভূতি আছে, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়!

এরপর ফেসবুকে মেসির রাজকীয় বিদায়ের ছোট ছোট ক্লিপগুলো দেখছিলাম, আর বিস্মিত হচ্ছিলাম। একই সঙ্গে ভীষণ আনন্দিত হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, আর্জেন্টিনা তাদের ফুটবল জাদুকরকে বিদায়ী সম্মান জানাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। বরং ভালোবাসা, সম্মান আর শ্রদ্ধার সবটুকুই যেন উজাড় করে দিয়েছে।

সতীর্থদের চোখেমুখে মেসির প্রতি যে ভালোবাসা, যে শ্রদ্ধা, যে আবেগ দেখেছি, তা সত্যিই শিক্ষণীয়। একজন মানুষ কতটা আপন হয়ে উঠলে তাঁর বিদায়ের মুহূর্তে গোটা দল এভাবে ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রাখতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ এই বিদায়।

ম্যাচের শুরুতে ধারাভাষ্যকারের একটি কথা কানে বাজল—

‘ফুটবলকে তার আর দেওয়ার কিছু নেই। দেখা যাক, আজ ফুটবল তাকে কী দেয়।’

কথাটা শুনে মনে হলো, সত্যিই তো! ফুটবলকে আর কী দেওয়ার বাকি রেখেছেন এই মানুষটি? কিন্তু মেসি কি নিজে কখনো এভাবে ভাবেন? আমার মনে হয় না। কারণ, তাঁর কাছে ফুটবল কখনো নিজেকে প্রমাণ করার মঞ্চ ছিল না; বরং ছিল ভালোবাসা, দায়িত্ব আর দলকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

ম্যাচের ১০ মিনিটে রেফারির বাঁশি বেজে উঠতেই মেসির বিস্মিত চোখের চাহনি যেন অনেক কিছু বলে দিল। কী হলো, খেলা থামল কেন? মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তিনি নিজেও যেন ভুলে গেছেন যে তাঁর প্রতি সম্মান জানাতেই ম্যাচের দশম মিনিটে এই বিশেষ বিরতি!

এই ছোট্ট মুহূর্তটিই যেন মেসির ব্যক্তিত্বের একটা দিক তুলে ধরল। চারপাশের পৃথিবী তাঁকে নিয়ে যত আয়োজনেই ব্যস্ত থাকুক না কেন, তিনি যেন নিজের খেলাটার মধ্যেই ডুবে থাকতে ভালোবাসেন।

এরপর গোল করলেন মেসি। আর সেই গোলের পর যা ঘটল, তা ছিল নিছক উদ্‌যাপনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। সতীর্থরা ছুটে এলেন, ডাগআউট থেকেও সবাই এগিয়ে এসে তাঁকে ঘিরে ধরলেন। শুরু হলো সম্মিলিত আনন্দ, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গোল হয়ে নাচ।

মাঝখানে মেসি, চারপাশে তাঁর সতীর্থরা–ভালোবাসার এক অপূর্ব দৃশ্য!

অথচ সেই উদ্‌যাপনও বেশিক্ষণ চলতে দিলেন না মেসি নিজেই। যেন বলতে চাইলেন, আনন্দটা সবার, মুহূর্তটা সবার; এখানে একজনকে ঘিরে সবকিছু আটকে থাকার প্রয়োজন নেই।

খেলার চেয়ে কেউ বড় নয়—মেসি যেন সারা জীবন এই দর্শনটাই ধারণ করে এসেছেন। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বড়াই করা তো দূরের কথা, নিজেকে সর্বকালের সেরা বলতেও তাঁর বরাবরই অনীহা। অথচ ফুটবলবিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাঁকে কোথায় বসিয়ে রেখেছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিদায়ের ভাষণে মেসি যখন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন, তখন উঠে এসেছিল ব্যক্তিগত জীবনের নানা স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা, বাবাকে হারানোর বেদনা—আরও কত আবেগঘন মুহূর্ত।

কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি ছিল, তিনি নিজের অর্জনের কৃতিত্ব একা নিজের কাঁধে তুলে নেননি। বরং সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন—‘ধন্যবাদ, তোমরা আমাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়েছ।’

কী অসাধারণ বিনয়! যে মানুষটির হাত ধরে আর্জেন্টিনা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে, যাঁর জাদুকরি পায়ে লেখা হয়েছে ইতিহাসের পর ইতিহাস, সেই মানুষটিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব তুলে দিলেন তাঁর সতীর্থদের হাতে!

তিনি মনে করিয়ে দিলেন, এই জয় কোনো একজনের একক কৃতিত্ব নয়। এর পেছনে রয়েছে একসঙ্গে লড়াই করার গল্প, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর গল্প, অসংখ্য মানুষের ত্যাগ আর বিশ্বাসের গল্প।

তিনি শুধু বর্তমান প্রজন্মের জয়গান করেননি; শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন অতীতের সেই খেলোয়াড়দেরও, যাঁরা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও আর্জেন্টিনাকে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা এনে দিতে পারেননি।

কারণ, মেসি জানেন, ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের নিরলস চেষ্টা, স্বপ্ন, ব্যর্থতা আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

তাঁর কথায় যেন সেই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিধ্বনি শোনা গেল।

আমরা সব সময় লড়াই করেছি। এই জার্সির জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি।

কথাগুলো শুধু একজন ফুটবলারের বিদায়ী ভাষণ নয়; বরং একটা দলের দীর্ঘ পথচলা, বিশ্বাস আর আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতিও মেসির কৃতজ্ঞতা ছিল অকৃত্রিম। এই সমর্থকেরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের হিসাব ভুলে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে দলের পাশে দাঁড়ান। কখনো ইউরোপে, কখনো আফ্রিকায়, কখনো আমেরিকায়—দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জনদের থেকে দূরে থেকেও তাঁরা আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে গ্যালারিতে হাজির হন।

মেসি তাঁদের ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়ে বললেন, তাঁরা সব সময় পাশে ছিলেন বলেই বিদেশের মাঠেও তাঁর মনে হয়েছে, যেন নিজেদের ঘরের মাঠে খেলছেন।

ভাবুন তো, একজন ফুটবলারের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া—এমন অর্জন কোনো ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না।

মেসির ফুটবলদর্শন বরাবরই ছিল দলকেন্দ্রিক। তাঁর কাছে গোল করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সতীর্থকে দিয়ে গোল করানো। একজন ডিফেন্ডারের সময়োপযোগী ট্যাকল, বিপজ্জনক মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করা কিংবা গোলরক্ষকের অসাধারণ সেভ-সবকিছুরই রয়েছে সমান মূল্য।

কারণ, ফুটবল কখনো একজনের খেলা নয়। এখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে, কিন্তু দলীয় ঐক্যই একটি দলকে চ্যাম্পিয়ন করে তোলে।

আর মেসির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই। তিনি নিজের অসাধারণ প্রতিভাকে কখনো দলের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। বরং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন সতীর্থদের অবদান, সমর্থকদের ভালোবাসা আর একটি জাতির দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে।

এটাই টিম স্পিরিট। এটাই নেতৃত্ব। এটাই মেসি!

নিজেকে বড় করে তোলার জন্য অন্য কাউকে ছোট করার প্রয়োজন হয় না—মেসি যেন তাঁর পুরো ক্যারিয়ার দিয়ে এই সত্যটাই প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মহত্ত্ব শুধু অসংখ্য গোল, অ্যাসিস্ট, রেকর্ড কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে তাঁর বিনয়ে, সতীর্থদের প্রতি সম্মানে এবং ‘আমি’কে ছাপিয়ে ‘আমরা’ হয়ে ওঠার অসাধারণ ক্ষমতায়।

হয়তো এ কারণেই মেসি শুধু একজন ফুটবল তারকা নন; তিনি কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যে মানুষটি মাঠে জাদু দেখিয়েছেন, মাঠের বাইরেও তিনি শিখিয়েছেন বিনয়ী হতে, কৃতজ্ঞ হতে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে।

বিদায় বলাটা তাই বড্ড কঠিন!

তবে কিছু কিংবদন্তির বিদায় কখনো শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা থেকে যান স্মৃতিতে, ভালোবাসায়, অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি!
ফুটবলকে এত সুন্দর করে তোলার জন্য।
আমাদের এত আনন্দ, এত আবেগ আর এত স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য।

তুমি হয়তো একদিন মাঠের আলো থেকে সরে যাবে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তোমার জন্য যে জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানে তোমার অবসর নেই।

তুমি ছিলে, তুমি আছ, তুমি থাকবে—চিরকাল!

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..