নারায়ণগঞ্জ শহরের সদর থানাধীন নতুন জিমখানা কলোনীতে দিন দিন বেড়েই চলেছে মাদক, জুয়া, সুদ বাণিজ্য ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দৌরাত্ম্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে প্রকাশ্যে এসব অপকর্ম পরিচালিত হলেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অপরাধীদের একটি অংশকে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করে আসছে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, নামধারী সাংবাদিক ও কথিত সোর্স পরিচয়ধারীরা। অভিযোগ রয়েছে, মাসিক মাসোহারা ও বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে তারা অপরাধীদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। এতে করে কলোনীতে অপরাধের বিস্তার আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, পুরাতন ও নতুন জিমখানা মিলিয়ে প্রায় ৩০০টিরও বেশি ঘর রয়েছে এবং ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। তবে বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেক পরিবার সেখানে বসবাস না করে ঘর ভাড়া দিয়ে অন্যত্র থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিক্ষার অভাবে অপরাধচক্র এখানে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
অনেকের ভাষ্যমতে, এক সময়ের আলোচিত টানবাজার পতিতালয়ের কিছু ব্যক্তির সঙ্গে এ কলোনীর লোকজনের পূর্ব থেকেই যোগাযোগ ছিল। টানবাজার উচ্ছেদের পর তাদের অনেকে এসে জিমখানা এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। এরপর থেকেই মাদক, জুয়া, নারী ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কলোনীর বৃহৎ জনসংখ্যাকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি আন্দোলন, মিছিল-মিটিং ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে নেতা বনে গেছে। তবে কলোনীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন বা অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। বরং দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে ব্যবহার করে অবৈধ আয়ের পথে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি জিমখানা কলোনীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মাদকবিরোধী সভা-সমাবেশ, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও চলছে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই হবে না; একইসঙ্গে জুয়া, সুদের কারবার, চুরি, ছিনতাই ও নারী ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, নতুন জিমখানায় কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে মৃত আলী হোসেনের সন্তান আলো ও আলম চানের নাম বেশি আলোচনায় এলেও অন্তরালে থেকে যাচ্ছে আরও অনেকের নাম। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে হাঁসি, লেংরা বাবু, পারভিন, ঢলি, জগৎ বাবু ও মনির ওরফে ‘গাঁজা মনির’-এর নামও। তবে ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
অন্যদিকে কলোনীতে সমিতির আড়ালে উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু ব্যক্তি দরিদ্র মানুষকে জিম্মি করে সুদের কারবার পরিচালনা করছে এবং অপরাধীদের অর্থায়ন করছে। এদের মধ্যে খোরশেদ, জনি, শাকিল, অপু, মিজান, রনি ও আরমানের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত। একই সঙ্গে সমিতির অফিসে জুয়ার আসর বসিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যবসার সঙ্গে রাব্বি ও রানার সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যাচ্ছে।
খোরশেদ ও তার স্ত্রী আরশিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা কলোনীতে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আন্দোলনের নেপথ্যে কাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই তারা কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
খোরশেদ সম্পর্কে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তিনি একাধিক বিয়ে করেছেন এবং শহর ও বন্দরে পৃথক সংসার পরিচালনা করছেন। তার আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সচেতন মহলের দাবি, যেহেতু এটি রেলওয়ের সরকারি জমি এবং মূলত রেলওয়ে কর্মচারীদের আবাসনের জন্য বরাদ্দকৃত এলাকা, তাই সরকারি তত্ত্বাবধানে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কেউ যেন ব্যক্তিগত স্বার্থে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সেদিকেও নজরদারির আহ্বান জানানো হয়েছে।
এলাকাবাসী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি যারা অপরাধের পথ থেকে ফিরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাদের পুনর্বাসন ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...